ঢাকা , শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ :
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পরও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুরের দুই আসনে দাঁড়িপাল্লার জয়ঃ গণভোটে “হ্যা” মেহেরপুরে ৮.৯ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন মেহেরপুরে ডিবির অভিযানে ১০ বোতল ভারতীয় মদসহ গ্রেপ্তার-১ মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন মেহেরপুরে ধানের শীষের প্রচারণার দায়িত্বে প্রিন্স আহমেদ ইমরান একাই তিন পদ, এক যুগ এক জেলাঃ মেহেরপুর মেহেরপুরে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে ‘সুপার ক্যারাভান’ প্রচারণা মেহেরপুর-১ আসনের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন বিএনপি নেত্রী রোমানা আহমেদ মেহেরপুরে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ৫ রাউন্ড গুলিসহ দুই যুবক আটক অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট প্রসেনজিৎ হালদার গ্রেপ্তার
বিজ্ঞপ্তি :
শীঘ্রই শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে মেহেরপুর নিউজ এর  বস্তুনিষ্ঠ তথ্যে, চারপাশের খবর" নিয়ে শীঘ্রই আসছে মেহেরপুর নিউজ অনুসন্ধানী সংবাদ
রেশন কাণ্ডে যুবলীগ নেত্রী হাসিনা ও রুবেল-ইমা দম্পত্তির কোটি টাকার প্রতারণা

পুলিশ লাইনের রেশন পণ্যের ব্যবসার নামে প্রতারণা

পুলিশ লাইনের রেশন পণ্যের নাম ভাঙিয়ে দেড়শরও বেশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা ও পরিশ্রমী মানুষের ঘামঝরা কোটি টাকা স্থানীয় যুবলীগ নেত্রী হাসিনার সহায়তাই গিলে খেয়েছে ভয়ঙ্কর প্রতারক দম্পতি, চাকরিচ্যুত এএসআই রুবেল ও তার স্ত্রী ইমা! বাজার কমিটি ও সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ এবং থানায় অভিযোগ করার পরও কোথাও মিলছে না প্রতিকার !
ভয়ঙ্কর এই প্রতারক দম্পত্তির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব জেলার প্রায় দেড় শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যেক্তা। পুলিশ লাইনের রেশনের ব্যবসা ও ব্যবসায় টাকা খাটিয়ে লাভ দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রায় এক বছর ধরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক দম্পত্তি রুবেল শেখ ও তানিশা ইয়াসমিন ইমা। রুবেল শেখ পুলিশের এএসআই পদমযর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর মামলা ও মাদক সম্পৃক্ততায় তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আর তাদের এ কর্মকাণ্ডে সহযোগীতা করেছেন সুমন হোসেন নামের পুলিশের এসআই পদমযর্যাদার এক কর্মকর্তা, স্থানীয় যুবলীগ নেত্রী হাসিনা খাতুন ও ইমার মা মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের স্টাফ আয়েশা খাতুন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ায় পুলিশ লাইনের রেশন সামগ্রীর নামে সয়াবিন তেল, চাল, চিনি ও ডাল সরবরাহের ব্যবসা দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সাসপেন্ড হওয়া পুলিশের এএসআই রুবেল ও তার স্ত্রী তানিশা ইয়াসমিন ইমার বিরুদ্ধে। প্রথমে স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে আস্থা অর্জন করলেও পরবর্তীতে হঠাৎ সব ধরনের পণ্য দেওয়া বন্ধ করে দেন তারা। ভুক্তভোগীরা জানান, অন্তত দেড়শো মানুষ তাদের কাছে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা পাওনা। ক্তভোগীদের অভিযোগ প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্রটি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ায় সরজমিনে যেয়ে জানা গেছে প্রতারক দম্পত্তির ভয়ঙ্কর প্রতারণার গল্প।
পাবনা থেকে এসে মেহেরপুরে দর্জির কাজ করা শিউলী খাতুন জানান, অগ্রিম দেওয়া ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এখনো পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, ইমা ও শেলী ঘনিষ্ঠতার সুযোগে তার গলার চেইন ও কানের দুল নেন, যা ফেরত দেয়নি। পরবর্তীতে টাকা চাইতে গেলে ইমা, তার মা ও সহযোগী হাসিনা মিলে তাকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাশারী বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. শফিউল আলম বলেন, মেহেরপুর শহরের কাশারী বাজারে আমার একটি দোকান আছে। ওদের কাছ থেকে আমার স্ত্রী মাল কিনলে সেই মাল আমি দোকানে রেখে বিক্রি করি। এছাড়াও এইসব মাল আমি বড়বাজার আশা স্টোর এবং বামন পাড়ার সোহাগ ষ্টোরসহ বিভিন্ন দোকানে পাইকারি বিক্রি করেছি। কিন্তু অগ্রিম টাকা নিয়ে হঠাৎ করে মাল দেওয়া বন্ধ করে দেয় তারা। বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে, নতুন করে ডিও করার কথা বলে। বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানালে সেনাবাহিনীর সামনে তারা সবকিছু স্বীকার করে এবং টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করে। সেনাবাহিনী পরের দিন বিকেল পাঁচটায় থানায় বসার পরামর্শ দেয়। মেহেরপুর সদর থানায় এসআই অমিত কুমারের নেতৃত্বে একটা বৈঠক হয়। কিন্তু সেখানে আমরা কোন বিচার পাইনি। কারণ ইমার স্বামী পুলিশে চাকরি করেছে বলে এসআই অমিত আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং টাকা কোথায় পেয়েছি জিজ্ঞাসাবাদ করে। থানা থেকে ঘুরে এসে দেখি ঈমার মা আমাদের বাড়িতে তালা মেরে দিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দিলে সেনাবাহিনী এসে আমাদের তালা খুলে দেয় এবং ইমা ও তার মাকে থানায় সোপর্দ করে। পরবর্তীতে কিভাবে জানি সেই রাতেই ইমা ও তার মা আবার থানা থেকে চলে এসেছে। আমি থানা ও বাজার কমিটিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু ইমা ও তার মা কখনোই খানা বা বাজার কমিটিতে হাজির হয়নি। এদের সাথে পুলিশ লাইনে চাকরি করা এস আই সুমনও যুক্ত। তিনি আমাদের বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করেছেন।
নারী উদ্যোক্তা রেহানা খাতুন বলেন, ‘আমি একজন উদ্যোক্তা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ১৭ টি আইটেমের ব্যবসা করে আসছি। পেয়াদা পাড়ার হাসিনার কথাতে আমি আমার ব্যবসাতে সয়াবিন তেল সংযুক্ত করি। হাসিনার মাধ্যমে ইমা, এএসআই রুবেল এবং আয়েশা খাতুন আমার সাথে যোগাযোগ করে এবং বলে আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, এই লাইসেন্স দিয়ে আমরা পুলিশ লাইনে রেশনের মালামালের ব্যবসা করি। তাদের এই কথাতে আমি তাদের সাথে তেলের ব্যবসায় রাজি হই। এরপর তাদের আমি অর্ডার বাবদ অগ্রিম টাকা দিই। এরপর তারা আমাকে ৬ বার তেল সরবরাহ করে। তাদেরকে সবসময়ই অর্ডারের টাকা অগ্রিম পরিষদ করতে হতো। এক পর্যায়ে আমি তাদেরকে চারটা নতুন অর্ডার দিই। ১ লাখ ৫৬ হাজার করে তিনটা অর্ডার এবং ৮৪ হাজারের একটা অর্ডার। এই অর্ডার দেয়ার পর থেকে সাত মাস যাবত আমাকে ঘুরাচ্ছে। আমাকে তেলও দেয় না আবার টাকাও ফেরত দেয় না। আমি বাজার কমিটিতে একটি অভিযোগ করেছি, বাজার কমিটি আমাকে একটি প্রত্যয়ন পত্র দিয়েছে। আমি মেহেরপুর সদর থানাতেও একটা অভিযোগ করেছিলাম সেখানে সালিশে তারা টাকা পয়সা নেওয়ার ব্যাপারটা স্বীকার করলেও ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেসময় মেহেরপুর সদর থানায় দায়িত্ব রতন এসআই অমিত কুমর আমাকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যায়িত করে বলেন ১৭ বছর তো অনেক কামিয়েছেন, আপনার এই টাকা না নিলেই বা কি হবে।আমি আদালতে মামলা করার প্রক্রিয়ার দিকে আগাচ্ছি।
এলাকার অপর নারী উদ্যোক্তা আসমানি খাতুন জানান, রেশনের তেল সরবরাহের নামে দেড় লাখ টাকা নিলেও এক বছরেও কোনো মালামাল পাননি।
 নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকে দাবি করেন, কেউ দুই লাখ, কেউ পাঁচ লাখ, কেউবা বিশ লাখ পর্যন্ত দিয়েছেন। প্রথমে সরবরাহ দিলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরোপুরি বন্ধ।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শিমুল খান জানান, পুলিশের রেশন সামগ্রী সরবরাহের কথা বলে তার কাছ থেকে অগ্রিম দুই লাখ টাকা নেওয়া হয় আট মাস আগে। এরপর আর কোন মালামাল দেয়নি, টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি।
এ সকল ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সালিশ ও আলোচনার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পরও ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, গণমাধ্যমে কথা বলায় সোমবার রাত ৯টার দিকে ইমা ভুক্তভোগী শেলীর বাড়ির গেটে যেয়ে প্রকাশ্যে গালাগাল ও হুমকি-ধামকি দেন।
রিকশাচালক রুবেল, যিনি দীর্ঘদিন চক্রটির হয়ে পণ্য সরবরাহ করতেন। তিনি বলেন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যবসা বন্ধ। ইমা ও রুবেলের নির্দেশেই সব করা হতো বলে জানান তিনি।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে এসআই সুমন জানান, রুবেলের সঙ্গে চাকরি সূত্রে পরিচয় থাকলেও ব্যবসার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এস আই সুমনকে ডিও স্যার সাজিয়ে তারা এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এস আই সুমনও ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়ে টাকা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। এসআই সুমনের এসকল স্বীকারোক্তীর রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে মূল অভিযুক্ত তানিশা ইয়াসমিন ইমাকে ফোন পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ে ইমার স্বামী চাকরিচ্যুত এএস আই রুবেল শেখ প্রথমে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্নজনের কাছে ঋণ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি প্রতিবেদককে তার সাথে দেখা করে চা খাওয়া ও গল্প করার প্রস্তাবও দেন।
তবে, হাসিনা খাতুন এই প্রতিবেদকের কাছে প্রথমে টাকা নেওয়া ও প্রতারক চক্রের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও পরে প্রতিবেদককে ফোন দিয়ে পরিচয় জানতে চেয়ে হুমকি দেন।
ভুক্তভোগীরা হাসিনা খাতুনের বিষয়ে অভিযোগ করে বলেন, তার ইসলামি ব্যাংকের একাউন্টে লেনদেনের মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালনা করতো ইমা ও রুবেল। হাসিনা সাবেক পৌর মেয়রের বাসায় কাজ করতো। তার একাউন্টের হিসাব দেখলে বোঝা যাবে টাকার উৎস কি।
মেহেরপুর সদর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে। প্রায় কোটির টাকা কিছু অভিযোগের কথা শুনেছি। এসআই অমিতের মাধ্যমে একজনের সমস্যার সমাধানও করেছি।অন্যদের মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। এরপরও যদি নতুন কেউ লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসে, সেক্ষেত্রে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, একই কৌশলে শহর ও আশপাশের বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পুলিশ লাইনের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করে ভুক্তভোগীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। একাধিক লিখিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দ্রুত তদন্ত করে এ চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেছেন, পুলিশ সদস্যের নাম জড়িত থাকায় কেউই প্রথমে সন্দেহ করেননি। এখন পুরো এলাকা অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিমত তাদের।

অনুগ্রহ করে আপনার মতামত আমাদের পাঠান

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পরও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুরের দুই আসনে দাঁড়িপাল্লার জয়ঃ গণভোটে “হ্যা”

রেশন কাণ্ডে যুবলীগ নেত্রী হাসিনা ও রুবেল-ইমা দম্পত্তির কোটি টাকার প্রতারণা

পুলিশ লাইনের রেশন পণ্যের ব্যবসার নামে প্রতারণা

আপলোডের সময় : ০১:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
পুলিশ লাইনের রেশন পণ্যের নাম ভাঙিয়ে দেড়শরও বেশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা ও পরিশ্রমী মানুষের ঘামঝরা কোটি টাকা স্থানীয় যুবলীগ নেত্রী হাসিনার সহায়তাই গিলে খেয়েছে ভয়ঙ্কর প্রতারক দম্পতি, চাকরিচ্যুত এএসআই রুবেল ও তার স্ত্রী ইমা! বাজার কমিটি ও সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ এবং থানায় অভিযোগ করার পরও কোথাও মিলছে না প্রতিকার !
ভয়ঙ্কর এই প্রতারক দম্পত্তির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব জেলার প্রায় দেড় শতাধিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যেক্তা। পুলিশ লাইনের রেশনের ব্যবসা ও ব্যবসায় টাকা খাটিয়ে লাভ দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রায় এক বছর ধরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারক দম্পত্তি রুবেল শেখ ও তানিশা ইয়াসমিন ইমা। রুবেল শেখ পুলিশের এএসআই পদমযর্যাদার কর্মকর্তা ছিলেন। প্রথম স্ত্রীর মামলা ও মাদক সম্পৃক্ততায় তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছেন। আর তাদের এ কর্মকাণ্ডে সহযোগীতা করেছেন সুমন হোসেন নামের পুলিশের এসআই পদমযর্যাদার এক কর্মকর্তা, স্থানীয় যুবলীগ নেত্রী হাসিনা খাতুন ও ইমার মা মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের স্টাফ আয়েশা খাতুন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেরপুর শহরের পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ায় পুলিশ লাইনের রেশন সামগ্রীর নামে সয়াবিন তেল, চাল, চিনি ও ডাল সরবরাহের ব্যবসা দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ সাসপেন্ড হওয়া পুলিশের এএসআই রুবেল ও তার স্ত্রী তানিশা ইয়াসমিন ইমার বিরুদ্ধে। প্রথমে স্বল্প মূল্যে পণ্য সরবরাহ করে আস্থা অর্জন করলেও পরবর্তীতে হঠাৎ সব ধরনের পণ্য দেওয়া বন্ধ করে দেন তারা। ভুক্তভোগীরা জানান, অন্তত দেড়শো মানুষ তাদের কাছে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা পাওনা। ক্তভোগীদের অভিযোগ প্রায় ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এ চক্রটি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল সোমবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে পুরাতন পোস্ট অফিস পাড়ায় সরজমিনে যেয়ে জানা গেছে প্রতারক দম্পত্তির ভয়ঙ্কর প্রতারণার গল্প।
পাবনা থেকে এসে মেহেরপুরে দর্জির কাজ করা শিউলী খাতুন জানান, অগ্রিম দেওয়া ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা এখনো পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, ইমা ও শেলী ঘনিষ্ঠতার সুযোগে তার গলার চেইন ও কানের দুল নেন, যা ফেরত দেয়নি। পরবর্তীতে টাকা চাইতে গেলে ইমা, তার মা ও সহযোগী হাসিনা মিলে তাকে মারধর করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
কাশারী বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. শফিউল আলম বলেন, মেহেরপুর শহরের কাশারী বাজারে আমার একটি দোকান আছে। ওদের কাছ থেকে আমার স্ত্রী মাল কিনলে সেই মাল আমি দোকানে রেখে বিক্রি করি। এছাড়াও এইসব মাল আমি বড়বাজার আশা স্টোর এবং বামন পাড়ার সোহাগ ষ্টোরসহ বিভিন্ন দোকানে পাইকারি বিক্রি করেছি। কিন্তু অগ্রিম টাকা নিয়ে হঠাৎ করে মাল দেওয়া বন্ধ করে দেয় তারা। বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে, নতুন করে ডিও করার কথা বলে। বিষয়টি সেনাবাহিনীকে জানালে সেনাবাহিনীর সামনে তারা সবকিছু স্বীকার করে এবং টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকার করে। সেনাবাহিনী পরের দিন বিকেল পাঁচটায় থানায় বসার পরামর্শ দেয়। মেহেরপুর সদর থানায় এসআই অমিত কুমারের নেতৃত্বে একটা বৈঠক হয়। কিন্তু সেখানে আমরা কোন বিচার পাইনি। কারণ ইমার স্বামী পুলিশে চাকরি করেছে বলে এসআই অমিত আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে এবং টাকা কোথায় পেয়েছি জিজ্ঞাসাবাদ করে। থানা থেকে ঘুরে এসে দেখি ঈমার মা আমাদের বাড়িতে তালা মেরে দিয়েছে। পরবর্তীতে আমরা সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দিলে সেনাবাহিনী এসে আমাদের তালা খুলে দেয় এবং ইমা ও তার মাকে থানায় সোপর্দ করে। পরবর্তীতে কিভাবে জানি সেই রাতেই ইমা ও তার মা আবার থানা থেকে চলে এসেছে। আমি থানা ও বাজার কমিটিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। কিন্তু ইমা ও তার মা কখনোই খানা বা বাজার কমিটিতে হাজির হয়নি। এদের সাথে পুলিশ লাইনে চাকরি করা এস আই সুমনও যুক্ত। তিনি আমাদের বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করেছেন।
নারী উদ্যোক্তা রেহানা খাতুন বলেন, ‘আমি একজন উদ্যোক্তা। ফেসবুক পেজের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ১৭ টি আইটেমের ব্যবসা করে আসছি। পেয়াদা পাড়ার হাসিনার কথাতে আমি আমার ব্যবসাতে সয়াবিন তেল সংযুক্ত করি। হাসিনার মাধ্যমে ইমা, এএসআই রুবেল এবং আয়েশা খাতুন আমার সাথে যোগাযোগ করে এবং বলে আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, এই লাইসেন্স দিয়ে আমরা পুলিশ লাইনে রেশনের মালামালের ব্যবসা করি। তাদের এই কথাতে আমি তাদের সাথে তেলের ব্যবসায় রাজি হই। এরপর তাদের আমি অর্ডার বাবদ অগ্রিম টাকা দিই। এরপর তারা আমাকে ৬ বার তেল সরবরাহ করে। তাদেরকে সবসময়ই অর্ডারের টাকা অগ্রিম পরিষদ করতে হতো। এক পর্যায়ে আমি তাদেরকে চারটা নতুন অর্ডার দিই। ১ লাখ ৫৬ হাজার করে তিনটা অর্ডার এবং ৮৪ হাজারের একটা অর্ডার। এই অর্ডার দেয়ার পর থেকে সাত মাস যাবত আমাকে ঘুরাচ্ছে। আমাকে তেলও দেয় না আবার টাকাও ফেরত দেয় না। আমি বাজার কমিটিতে একটি অভিযোগ করেছি, বাজার কমিটি আমাকে একটি প্রত্যয়ন পত্র দিয়েছে। আমি মেহেরপুর সদর থানাতেও একটা অভিযোগ করেছিলাম সেখানে সালিশে তারা টাকা পয়সা নেওয়ার ব্যাপারটা স্বীকার করলেও ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সেসময় মেহেরপুর সদর থানায় দায়িত্ব রতন এসআই অমিত কুমর আমাকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যায়িত করে বলেন ১৭ বছর তো অনেক কামিয়েছেন, আপনার এই টাকা না নিলেই বা কি হবে।আমি আদালতে মামলা করার প্রক্রিয়ার দিকে আগাচ্ছি।
এলাকার অপর নারী উদ্যোক্তা আসমানি খাতুন জানান, রেশনের তেল সরবরাহের নামে দেড় লাখ টাকা নিলেও এক বছরেও কোনো মালামাল পাননি।
 নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকে দাবি করেন, কেউ দুই লাখ, কেউ পাঁচ লাখ, কেউবা বিশ লাখ পর্যন্ত দিয়েছেন। প্রথমে সরবরাহ দিলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পুরোপুরি বন্ধ।
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শিমুল খান জানান, পুলিশের রেশন সামগ্রী সরবরাহের কথা বলে তার কাছ থেকে অগ্রিম দুই লাখ টাকা নেওয়া হয় আট মাস আগে। এরপর আর কোন মালামাল দেয়নি, টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি।
এ সকল ঘটনায় স্থানীয়ভাবে সালিশ ও আলোচনার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের পরও ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, গণমাধ্যমে কথা বলায় সোমবার রাত ৯টার দিকে ইমা ভুক্তভোগী শেলীর বাড়ির গেটে যেয়ে প্রকাশ্যে গালাগাল ও হুমকি-ধামকি দেন।
রিকশাচালক রুবেল, যিনি দীর্ঘদিন চক্রটির হয়ে পণ্য সরবরাহ করতেন। তিনি বলেন এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই ব্যবসা বন্ধ। ইমা ও রুবেলের নির্দেশেই সব করা হতো বলে জানান তিনি।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে যোগাযোগ করা হলে এসআই সুমন জানান, রুবেলের সঙ্গে চাকরি সূত্রে পরিচয় থাকলেও ব্যবসার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এস আই সুমনকে ডিও স্যার সাজিয়ে তারা এ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এস আই সুমনও ভুক্তভোগীদের বাড়িতে গিয়ে টাকা দেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছে। এসআই সুমনের এসকল স্বীকারোক্তীর রেকর্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
তবে মূল অভিযুক্ত তানিশা ইয়াসমিন ইমাকে ফোন পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময়ে ইমার স্বামী চাকরিচ্যুত এএস আই রুবেল শেখ প্রথমে প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে বিভিন্নজনের কাছে ঋণ থাকার কথা স্বীকার করেন। তিনি প্রতিবেদককে তার সাথে দেখা করে চা খাওয়া ও গল্প করার প্রস্তাবও দেন।
তবে, হাসিনা খাতুন এই প্রতিবেদকের কাছে প্রথমে টাকা নেওয়া ও প্রতারক চক্রের সাথে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করলেও পরে প্রতিবেদককে ফোন দিয়ে পরিচয় জানতে চেয়ে হুমকি দেন।
ভুক্তভোগীরা হাসিনা খাতুনের বিষয়ে অভিযোগ করে বলেন, তার ইসলামি ব্যাংকের একাউন্টে লেনদেনের মাধ্যমে এ ব্যবসা পরিচালনা করতো ইমা ও রুবেল। হাসিনা সাবেক পৌর মেয়রের বাসায় কাজ করতো। তার একাউন্টের হিসাব দেখলে বোঝা যাবে টাকার উৎস কি।
মেহেরপুর সদর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে। প্রায় কোটির টাকা কিছু অভিযোগের কথা শুনেছি। এসআই অমিতের মাধ্যমে একজনের সমস্যার সমাধানও করেছি।অন্যদের মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। এরপরও যদি নতুন কেউ লিখিত অভিযোগ নিয়ে আসে, সেক্ষেত্রে আমি অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, একই কৌশলে শহর ও আশপাশের বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হয়েছেন। পুলিশ লাইনের নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করে ভুক্তভোগীদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। একাধিক লিখিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এখনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দ্রুত তদন্ত করে এ চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেছেন, পুলিশ সদস্যের নাম জড়িত থাকায় কেউই প্রথমে সন্দেহ করেননি। এখন পুরো এলাকা অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েছে বলে অভিমত তাদের।