
একই কর্মস্থলে এক যুগের বেশি সময় ধরে অবস্থান, বাতিল হওয়া বদলি আদেশ, রহস্যজনক পদোন্নতি এবং লাগাতার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে (পিডব্লিউডি) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোঃ জামাল উদ্দিনের ভূমিকা ঘিরে এখন আর প্রশ্ন শুধু অনিয়মের নয়, প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা তার স্থায়ী ঠিকানা হলেও মোঃ জামাল উদ্দিন ২০১৪ সালের ১ জুলাই মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২০ সালে তিনি সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পান। এরপর থেকে চলতি দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও দুইটি পদে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি একাই জেলা গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল), উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) এবং সহকারী প্রকৌশলী এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তার সরকারি পরিচিতি নম্বর ২০২০১৯০১০০০৯।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত মেয়াদ শেষে তার বদলির আদেশ জারি হলেও অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর ভাই ও ভগ্নিপতির সুপারিশে সেই আদেশ বাতিল করা হয়। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে একজন কর্মকর্তার বদলি আদেশ বাতিলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আত্মীয়তার সুপারিশ কোন আইন ও বিধির আওতায় বৈধতা পায়।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক বরাদ্দ ও ঠিকাদারি কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট একটি দপ্তরে একজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই স্থানে অবস্থান করলে যে স্বার্থের সংঘাত ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তৈরি হয়, মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভাগটির কার্যক্রম কার্যত একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিল ছাড় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট বলয়ের বাইরে যাওয়ার সুযোগ সীমিত।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ, কমিশন বাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং একটি অদৃশ্য অথচ শক্তিশালী প্রভাববলয় গড়ে তোলা। প্রশ্ন উঠছে একই ব্যক্তি কীভাবে বছরের পর বছর একই জেলায় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে ধরে রাখেন, আর সেই সময়ে উর্ধ্বতন প্রশাসন কীভাবে তা উপেক্ষা করে যায়।
আইন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বদলি নীতিমালা এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আচরণ) বিধিমালা, ২০১৮ স্পষ্টভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব গ্রহণ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করেছে। এসব বিধান লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে তা শুধু বিভাগীয় অপরাধ নয়, বরং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এবং দণ্ডবিধির ১৬১ থেকে ১৬৫ ধারার আওতায় ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে জামাল উদ্দিনের বদলি আদেশ বাতিলের নথি, সুপারিশপত্র এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ফাইলগুলো কি তদন্তের আওতায় আনা হবে? একই কর্মস্থলে এক যুগের বেশি সময় ধরে অবস্থানের দায় কি শুধু একজন কর্মকর্তার, নাকি এর পেছনে রয়েছে প্রশাসনের নীরব সম্মতি।
সচেতন মহলের মতে, এই ঘটনায় নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্ত না হলে তা একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে, যেখানে বদলি নীতিমালা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর থাকবে না। তারা অবিলম্বে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সকল নথি পর্যালোচনা এবং দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে এসডিই জামাল উদ্দিন প্রতিবেদককে বলেন, ‘এক যুগ না, আমি এই অফিসে বর্তমান পদে মাত্র এক বছর কর্মরত রয়েছি।’ তার এই বক্তব্যের কল রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
মেহেরপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি বিধি অনুযায়ী আমাদের দপ্তরে প্রত্যেক কর্মকর্তা তিন বছর দায়িত্ব পালন করলে বদলি হন, ক্ষেত্র বিশেষে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত থাকতে পারে। আমি অতিসম্প্রতি এখানে যোগদান করেছি, এজন্য এই বিষয়গুলো নিয়ে এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।’
গণপূর্ত অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ফজলুল হক বলেন, ‘জামাল উদ্দিন দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় তার একটি আলাদা প্রভাব তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ এসেছে, এটা সত্য। বর্তমানে নির্বাচনকালীন সময়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করার এখতিয়ার শুধুমাত্র নির্বাচন কমিশনের। তবে আগামী মাসে নির্বাচন শেষ হলে হয়তো তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তসহ অন্যত্র বদলীর সুপারিশ করা হতে পারে।’

খান মাহমুদ আল রাফি 









