
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুর জেলার দুটি সংসদীয় আসনেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে পরিবর্তনের পক্ষে “হ্যা” ভোট সংখ্যাগতভাবে এগিয়ে থাকলেও, মোট ভোটারের হিসাবে সেই সমর্থন অর্ধেকের সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে মেহেরপুরের রাজনৈতিক চিত্রে একদিকে সংসদীয় বিজয়ের স্পষ্টতা, অন্যদিকে গণভোটে জনমতের দ্বিধা, দুটি বাস্তবতা একসঙ্গে ফুটে উঠেছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে মেহেরপুর-১ সংসদীয় আসনে পোস্টাল ভোট বাদে ১২৩ টি কেন্দ্রের ফলাফলে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা তাজ উদ্দিন খান দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১ লাখ ২১ হাজার ৪৬১ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সমর্থিত প্রার্থী মাসুদ অরুন ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৪ হাজার ৭৮৭ ভোট। একই আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী মাত্র ৭৮১ ভোট এবং জাতীয় পার্টির প্রার্থী ১ হাজার ৩৯০ ভোট পাওয়ায় তারা জামানত বাজেয়াপ্তের মুখে পড়েছেন।
মেহেরপুর-২ সংসদীয় আসনে পোস্টাল ভোট বাদে ৯০ টি কেন্দ্রের ফলাফলে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাজমুল হুদা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৯৬ হাজার ৩০৬ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী আমজাদ হোসেন পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৯৮৮ ভোট। এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আব্দুল বাকী মাত্র ১ হাজার ৮২৫ ভোট পেয়ে নির্ধারিত সীমার নিচে থাকায় তার জামানতও বাজেয়াপ্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী কোনো প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের কমপক্ষে শতকরা সাড়ে ১২ শতাংশ ভোট না পেলে তার জমাকৃত জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, মেহেরপুরের দুইটি আসনে এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তিন প্রার্থীর জামানত হারানো প্রায় নিশ্চিত। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারিভাবে ফল ঘোষণা ও গেজেট প্রকাশের পরই জামানত বাজেয়াপ্তের আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার ঘোষিত বেসরকারি ফল অনুযায়ী, মেহেরপুর-১ আসনে ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৭৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ এবং মেহেরপুর-২ আসনে ৬৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। নারী ভোটারসহ সব বয়সী ভোটারদের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি।
একই দিনে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেহেরপুর জেলায় মোট ৫ লাখ ৮৭ হাজার ৬৮০ জন ভোটারের মধ্যে ৪ লাখ ২৪ হাজার ১৫ জন ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এর মধ্যে ৬৮ হাজার ৯২১ টি ব্যালট বাতিল হয়। বৈধ ভোটের হিসাবে “হ্যা” পড়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৯৮ টি এবং “না” ৭৬ হাজার ৯৯৬ টি। তবে মোট ভোটারের নিরিখে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ৪৭ দশমিক ২২ শতাংশ ভোটার।
মেহেরপুর-১ আসনে গণভোটে অংশগ্রহণ ও “হ্যা” ভোট তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও মোট ভোটারের হিসাবে সমর্থন ছিল ৪৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। অপরদিকে মেহেরপুর-২ আসনে এই হার দাঁড়িয়েছে ৪৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এতে স্পষ্ট হয় যে পরিবর্তনের পক্ষে জনমত শক্ত হলেও তা এখনো সর্বজনীন ঐকমত্যে পৌঁছায়নি।
সব মিলিয়ে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেহেরপুরের দুটি আসনে দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীদের স্পষ্ট বিজয়ের পাশাপাশি গণভোটের ফলাফল একটি দ্বিমাত্রিক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। সংসদীয় রাজনীতিতে পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেও, জনমতের গভীরে এখনো দ্বিধা ও প্রশ্ন রয়ে গেছে।

খান মাহমুদ আল রাফি 









